শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। দেশের চরম রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে জিয়াউর রহমান বাংঙ্গালী জাতির জীবনে আবির্ভূত হন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি দিকভ্রাšংÍ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা যোগান। পরবর্তীতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন, যা তাকে এই দর্শনের জনক রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জিয়াউর রহমানের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অবদান হলো ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ দর্শনের প্রবর্তন। এ দর্শন কেবল ভাষাভিত্তিক নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ। তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশে বসবাসকারী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টাান সব মিলে একক ‘বাংলাদেশী’ জাতি। তাঁর মাধ্যমেই সংবিধানে নাগরিক পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশী’-তে রূপান্তরিত হয়, যা একটি আধুনিক ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যখন দেশ ও জাতি ভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়, তখন মহান আল্লাহতায়ালা দিশেহারা জাতিকে মুক্তি ও কল্যাণের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের সার্বভৌম রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার তৌফিক দেন। ১৫ আগস্ট খোন্দকার মোস্তাক ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ দেশের উচ্চ পদস্থ ৫৬ জন অফিসার ও বিভিন্ন শ্রেণির নেতাদের আটক করেন। তৎকালীন পাট মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী কমিটির সভাপতি জলিল সাহেবের কথা মতে তিনিও নাকি সে সময় একই দিনে গ্রেপ্তার হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার গণবিপ্লবে কারাগার থেকে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সামরিক প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করার জন্য অনুরোধ করলে জিয়াউর রহমান দায়িত্বভার গ্রহণ করে সামরিক শাসনের মাধ্যমে দেশের আইন শৃঙ্খলাসহ ভয়ঙ্কর অভাব অনটন থেকে জাতিকে রক্ষা করেন। যুদ্ধ বিধস্ত দেশ আখ্যায়িত করে দেশে এমন অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল দেশ যা ভাষায় বুঝানো মুশকিল। ১০ টাকা চালের কেজি মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে হওয়াতে অর্ধহারে অনাহারে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। মৃত ব্যাক্তিদের কাপনের কাপড় ক্রয়ের ক্ষমতা না থাকায় কলা পাতা মুড়িয়ে দাপন করার প্রমাণ হাজারো। ভাতের অভাবে কলা গাছের মোথা সিদ্ধ করে খাওয়ার প্রমাণও আছে। তখন সিপাহী জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে ১০-১৫ দিনের মধ্যে যেমন অভাব অনটন দূর হয় তেমন আইন শৃঙ্খলা ও স্বভাবিক হয়। জনগণ সে থেকে মহান নেতাকে অতি আপনজন মনে করে বরণ করে নেয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ ও সার্কের উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ নেতা হিসাবে তুলনা করলে ভুল হবেনা। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেছিল, ‘মা জন্ম দেয়, মাটি লালন করে, এক সময় মায়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, কিন্তু মৃত্যুর পরেও মাটির প্রয়োজন থেকে যায়’ । কাজেই দেশ ও মাটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল বলেই জিয়ার উদ্ভাবিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি। শহীদ জিয়া এ দেশের মাটি ও মানুষকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতেন, একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন তিনি। দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণে তাঁর যুগান্তকারী দুঃসাহসী পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতার ঘোষক: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালিরা নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর বুক কেঁপে উঠে। তারা বুঝতে পারে বাঙালিকে আর শাসন ও শোষণ করা যাবে না। তাই কায়েমী স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার মানসে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া ভিত্তিহীন অজুহাত দাঁড় করিয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করতে থাকেন এবং গোপনে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র বাংলাদেশে পাঠাতে থাকেন। অতঃপর পশ্চিমা হানাদার বাহিনী অতর্কিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে বাঙালির উপর আক্রমণ চালায় এবং শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে। তখন নেতাহারা জাতি হয়ে পড়ে দিশেহারা। সে দুর্যোগ মুহূর্তে জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশ ও জাতিকে দিক নির্দেশনের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ফলে নেতৃত্বহীন জাতি স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জিয়ার নিজের নামের আদ্যাক্ষরে জেডফোর্স গঠন করা হয়। এ ফোর্স যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মাত্র ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
মানুষের মানসিকতার উপর প্রভাব না পড়ার লক্ষে বাংলাদেশের জলবায়ু বৈচিত্র্যময় এ দেশের মানুষের মন মানসিকতাও বৈচিত্র্যময়। শহীদ জিয়া তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি লক্ষ করেন যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আগ্রহ দেখানো জাতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়, যা অনেক বামপন্থী নেতা দেরীতে বুঝতে পারে। পরবর্তীতে ডাকসাইটে নেতা হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। প্রতিটি উন্নত দেশের নীতি নির্ধারকরা নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ, জনগণের সামর্থ, মন-মানসিকতা সৃষ্টি ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি প্রণয়ন করেন, যা সংশ্লিষ্ট দেশের জন্যই প্রযোজ্য। সে দৃষ্টিকোণ থেকেই শহীদ জিয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উদ্ভাবন করেন এবং একে ভিত্তি করে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করেন।
জিয়াউর রহমান শুধু দেশের উন্নয়নের চিন্তা করেন নাই, তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ২০০ কোটি মানুষের সার্বিক মঙ্গল, কল্যাণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা চিন্তা করে সার্ক গঠনের প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন কোনো মানুষ যেমন সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় তেমনিভাবে কোনো দেশ ও জাতি সব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হয় না। কাজেই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া যেমন সহজ হয়, একক প্রচেষ্টায় তা সম্ভব নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থপতি মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম অপরের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য দেয়া। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসে এক দলীয় স্বৈরশাসন কায়েম করা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কোনো চিন্তা ভাবনা ছিল না। ডিক্টোরশিপ কায়েম না করে এদেশের জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দেন। এ প্রেক্ষিতে তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনৈক রাজনৈতিক ভাষ্যকার মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মতো এত গণতন্ত্র তৃতীয় বিশ্বের কোথাও নেই।’
স্বাধীনতার পরবর্তী শাসককূল অপরিপক্ব, অদক্ষ হওয়ায় স্বজনপ্রীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। দেশে অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি ব্যাপকহারে সম্প্রসারণ ঘটে। শান্তিপ্রিয় জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার হারায়, বাক স্বাধীনতা খর্ব হয়। দেশ ও জাতি অন্ধকার যুগের মতো পাপ-পংকিলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বিদেশিরা এ দেশকে ‘বটমলেস বাসকেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। এহেন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে দেশ ও জাতির হাল ধরেন জিয়াউর রহমান। তিনি আরামকে হারাম করে দেশ ও জাতির উন্নয়নে ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আইনের শাসন কায়েম করে ধ্বংসপ্রায় দেশকে পুনর্গঠিত করেন। দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য উচ্চাবিলাসী আমলাদের নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন, নিজ হাতে কোদাল ধরে খাল কাটায় অংশ নিতেন।
কৃষক দরদী: শহীদ জিয়া কৃষি প্রধান দেশের কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে সর্ব প্রথম ১০০ কোটি টাকার সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন। অধিক খাদ্য ফলানোর লক্ষ্যে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটার ব্যবস্থাসহ নামমাত্র মূল্যে লাখ-লাখ টাকা মূল্যের গভীর নলকূপ কৃষকদের বিতরণ করেন। ফলে বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি বহুলাংশে হ্রাস পায় এবং মহাজনী ঋণের অক্টোপাশ থেকে কৃষককূল মুক্তি পায়।
শহীদ জিয়া শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন এবং আমূল সংস্কার সাধন করেন। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য এদেশে শত-শত স্কুল স্থাপন করেন। অবহেলিত মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক ধাঁচে যুগোপযোগী করেন। ফলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষিত আলেম-ওলামাও মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে পারছেন।
সৎ আদর্শবান ও ন্যায়পরায়ন: শহীদ প্রসিডেন্ট জিয়া ছিলেন অত্যন্ত সৎ, আদর্শবান ও ন্যায়পরায়ন। তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এক কপর্দকও গ্রহণ করতেন না, ন্যায়ের প্রশ্নে অতি আপনজনকেও প্রশ্রয় দিতেন না, শাসক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তার শাসন আমলে দেশে আইনের শাসন কায়েম হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়া স্বাধীনচেতা ছিলেন, মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতার পরিবর্তে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম সংযোজন করেন।’ তিনি ভারততোষণ নীতি পরিহার করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চালু করেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ভারত কর্তৃক দখলকরা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ আমাদের, আমরা যে কোনোমূল্যে তা উদ্ধার করবই।’ মোদ্দাকথা হলো, শহীদ জিয়ার বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতত্বে দেশে কৃষির বিকাশ ঘটে। শিল্পকারখানা গড়ে উঠে। বেকার যুবকদের কর্ম-সংস্থানের সুযোগ হয়। চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই হ্রাস পায়। দেশে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও জাতীয়তাবাদ জাতির কাছে আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর রেখে যাওয়া স্বনির্ভর অর্থনীতির দর্শন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবিচল সংকল্প আজও স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কেবল একজন সেনাপতি বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর প্রবর্তিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আজও এ দেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রধান স্তম্ভ হয়ে টিকে আছে।
লেখক- মানবাধিকার ব্যাক্তিত্ব, সিনিয়র সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ।

