আওয়ামী সরকারের আমলে ২০১৪ সালে চ্যানেল আই'র জনপ্রিয় উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে (৫৫) গ্রীনরোডের নিজ বাড়িতে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সারাদেশে তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই ওই বাসায় যান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য পুলিশ ও র্যাব্যকে নির্দেশ দেন। তবে ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে গেলে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লেখেন মাওলানা ফারুকীর ছেলে মাওলানা ফুয়াদ আল ফারুকী। এ ঘটনায় হত্যাকারীরা আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন নুরুল ইসলাম ফারুকীর স্ত্রীসহ কয়েকজন আত্মীয়স্বজন। এছাড়া ছিলেন মারুফ হাসান নামের এক আত্মীয়, যিনি ফুয়াদ আল ফারুকীর মামাতো ভাই।
তখন দরজায় হঠাৎ কলিংবেল বাজলে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলে ৭ জনের মতো লোক বলে, তারা হজ্বের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন। পরবর্তীতে তাদের সাথে আরও কয়েকজন হজ্বে যেতে চান এই মর্মে আরও ৭/৮ জনকে ডেকে আনেন হত্যাকারীরা। ফলে রুমে প্রায় ১৪/১৫ জনের মতো মানুষ হয়ে যায়।
এরপর মারুফ অন্য রুম থেকে চেয়ার নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে গেলেই দেখে হত্যাকারীরা মাওলানা ফারুকীকে পিস্তল, চাপাতি ধরে আছে এবং মারধর করছে। আর কিছু বুঝে উঠতেই মারুফ কে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানায় আরেক মুহুর্তেই লাথি ও পিস্তলের বাট দিয়ে মাথায় প্রচন্ড আঘাত করতে শুরু করে। একইসাথে কয়েকজন মিলে বেঁধে ফেলে মাওলানা ফারুকীকে।
পরবর্তীতে হত্যাকারীরা ভিতরের রুমে ঢুকে যায়। সেখানে মাওলানা ফারুকীর স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, তোমরা কারা? হত্যাকারীরা তখন বলে, আমরা আওয়ামী লীগ করি। বাইরে মিছিলে পুলিশ ধাওয়া করছে, তাই আশ্রয় নিতে আসছি। ফেসবুক পোস্ট থেকে মাওলানা ফারুকীর সন্তান মাওলানা ফুয়াদ আল ফারুকী বলেন, "আজ আব্বু চলে যাওয়ার ১০ বছর হলেও আমরা এই কথা বলতে পারিনি। সাংবাদিকরা পর্যন্ত আমাদেরকে নিষেধ করেছে যে, এই কথাটা বললে আপনারা বিচার পাবেন না।"
তখন হত্যাকারীরা পুরো বাড়ির সকল আসবাব পত্রের তালা ভেঙ্গে নগদ অর্থ স্বর্নালঙ্কার সহ মহিলাদের পরনে থাকা সব কিছুই নিয়ে যায়। তখন পর্যন্ত সবাই ভেবেছিলো হত্যাকারীরা হয়তো ডাকাত, টাকা পয়সা লুটপাট করে চলে যাবে। তখনও কেউ বুঝতে পারে নি হত্যাকারীদের আসল উদ্দেশ্য। শেষে যখন মাওলানা ফারুকী জিজ্ঞেস করে, তোমরা কেন এসেছ? কী চাও আমার কাছে ? জবাবে হত্যাকারীরা বলে, আমরা যা করতে এসেছি তা করে চলে যাব তুই জীবনের শেষ দোয়া কালাম পড়।
তখন মাওলানা ফারুকীকে মারতে মারতে এক পর্যায়ে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসে। সেখানে গলায় পাগড়ি পেঁচিয়ে দু পাশ দিয়ে টেনে ফাঁসের মতো করে ধরে। একসময় মাওলানা ফারুকী ছুটতে চাইলে বুকের ওপর ছুরি চালায় এবং পরবর্তীতে জবাই করে হত্যা করে এবং হত্যাকারীরা পালিয়ে যায়। উল্লেখ্য, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল সেদিন গ্রীনরোডের এক মিটিং এ ছিলেন যা ঘটনার থেকে মাত্র ৩০০/৪০০ গজ দূরে।
মাওলানা ফারুকীর সন্তান ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, মূলত তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার ধামাচাপা দিতেই মূলত বলির পাঠা করা হয় তার আব্বাকে। হত্যা দিয়ে হত্যা, ইস্যূ দিয়ে ইস্যূ ধামাচাপা দেয়ার এমন ঘৃণ্য কূটকৌশল আওয়ামীদের অনেক পুরনো নীতি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইসাথে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং কেসটি বিশেষ নির্দেশনায় পুনরায় তদন্তের মাধ্যমে বিচারিক পক্রিয়া চালু অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

